দ্বিজেন্দ্রলাল রায়: জীবন ও সাহিত্য
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৮৬৩-১৯১৩) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, নাট্যকার, গীতিকার ও দেশপ্রেমী সাহিত্যিক। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে বিশেষত নাটক ও দেশাত্মবোধক গানে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেন। তাঁর রচিত গান ও নাটক আজও বাঙালি সমাজে অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তোলে।
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৩ সালের ১৯ জুলাই নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে। তাঁর পিতা কার্তিকেয়চন্দ্র রায় ছিলেন একজন বিচারক এবং সংস্কৃতজ্ঞ, এবং তাঁর মা প্রসন্নময়ী দেবী ছিলেন এক বিদুষী নারী। পারিবারিক পরিবেশে সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা থাকায় ছোটবেলা থেকেই দ্বিজেন্দ্রলালের সাহিত্যপ্রেম গড়ে ওঠে।
শিক্ষা জীবন
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে স্কুল শিক্ষার পর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিবিদ্যায় পড়াশোনা করেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাব গ্রহণ করেন, যা তাঁর পরবর্তী সাহিত্যকর্মে প্রতিফলিত হয়।
কর্মজীবন
ইংল্যান্ড থেকে ফিরে আসার পর দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কৃষিবিভাগে কাজ শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন সরকারি পদে কাজ করলেও তাঁর মনে সবসময় সাহিত্য ও দেশপ্রেমের প্রতি টান ছিল। ব্রিটিশ শাসনের নানা অন্যায় আচরণ তাঁকে ক্ষুব্ধ করে, যা তাঁর লেখায় প্রকাশ পেয়েছে।
সাহিত্যকর্ম
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সাহিত্যকর্ম মূলত কবিতা, গান ও নাটককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তাঁর রচিত গান আজও বাঙালির হৃদয়ে অনুরণন তোলে।
(১) কবিতা ও গান
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বাংলা গানের জগতে এক বিশেষ স্থান অধিকার করেন। তাঁর রচিত দেশাত্মবোধক গান বাঙালি জাতীয়তাবাদকে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাঁর বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- "ধনধান্যে পুষ্পে ভরা"—এটি বাংলা ভাষার অন্যতম জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান, যা আজও বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।
- "বঙ্গ আমার জননী আমার"—দেশপ্রেমের অনন্য উদাহরণ।
তিনি "ডি. এল. রায়" নামেও পরিচিত ছিলেন এবং তাঁর লেখা গানগুলো "দ্বিজেন্দ্রগীতি" নামে পরিচিত।
(২) নাটক
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাটক বাংলা সাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য সম্পদ। তিনি ইতিহাসনির্ভর নাটক লিখে বাংলা মঞ্চনাটকে নতুন ধারা প্রবর্তন করেন। তাঁর নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- "সীতার বনবাস" (১৮৮১)
- "সাজাহান" (১৯০৯)
- "নূরজাহান" (১৯০৮)
- "চন্দ্রগুপ্ত" (১৯১১)
- "মেবার পতন" (১৯০৮)
তাঁর নাটকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ইতিহাসের প্রতি গভীর নিষ্ঠা এবং দেশপ্রেমের প্রকাশ।
দেশপ্রেম ও সমাজচিন্তা
দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ছিলেন একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। তাঁর সাহিত্যকর্মে বারবার দেশপ্রেমের বিষয়টি উঠে এসেছে। ব্রিটিশ শাসনের প্রতি তীব্র বিরোধিতা এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা তাঁর গান ও নাটকে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯১৩ সালের ১৭ মে মাত্র ৫০ বছর বয়সে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রয়াত হন। তাঁর সাহিত্য ও সংগীত আজও বাঙালি জাতির গর্ব এবং অনুপ্রেরণার উৎস।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের অবদান বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও মঞ্চনাট্যে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁর গান ও নাটক যুগ যুগ ধরে বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।
0 Comments