কাজী নজরুল ইসলাম: বিদ্রোহী কবির জীবন ও সাহিত্য
পরিচিতি
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ এবং দার্শনিক। তিনি ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তার অবদান অসাধারণ, যা তাকে ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।
শৈশব ও শিক্ষা
কাজী নজরুল ইসলামের শৈশব কাটে দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে। তার বাবা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মুয়াজ্জিন। মাত্র নয় বছর বয়সে পিতৃহীন হয়ে নজরুল জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন।
তিনি স্থানীয় মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন এবং পরে ময়মনসিংহের দরিরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে তাকে লেখাপড়া ছেড়ে রুটিরুজির সন্ধানে বের হতে হয়। তিনি ‘লেটো’ গানে যুক্ত হন এবং সেখান থেকেই তার সাহিত্য ও সংগীতের প্রতি আগ্রহ জন্মে। পরে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং সেখানে থাকাকালীন সময়েই সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যান।
সাহিত্যকর্ম ও বিদ্রোহী রূপ
১৯২২ সালে তার লেখা “বিদ্রোহী” কবিতাটি প্রকাশিত হলে তিনি সারা বাংলার মানুষের মনে এক বিদ্রোহী চেতনাকে জাগিয়ে তোলেন। এই কবিতার মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ ঘোষণা করেন। তিনি পরবর্তীতে “ভাঙার গান”, “প্রলয়োল্লাস”, “কান্ডারী হুঁশিয়ার” প্রভৃতি কবিতার মাধ্যমে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দেন।
তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- অগ্নিবীণা (১৯২২)
- সর্বহারা (১৯২৬)
- সন্ধ্যা (১৯৩০)
- সঞ্চিতা (১৯৩১)
গান ও সংগীত
নজরুল ইসলামের সঙ্গীত প্রতিভা অতুলনীয়। তিনি প্রায় ৪,০০০ গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন, যা ‘নজরুলগীতি’ নামে পরিচিত। তার গানগুলোর মধ্যে প্রেম, বিরহ, দেশপ্রেম, ইসলামিক ভাবধারা ও মানবতার বার্তা প্রকাশ পেয়েছে। কিছু বিখ্যাত গান হলো—
- "চল চল চল" (বাংলাদেশের রণসংগীত)
- "আমি চির বিদ্রোহী বীর"
- "মোর প্রিয় হলো দখিন হাওয়া"
- "ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে"
ধর্ম ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
নজরুল ছিলেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি ইসলামিক সংগীত যেমন রচনা করেছেন, তেমনই হিন্দু দেব-দেবীর বন্দনাও করেছেন। তার লেখায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ দেখা যায়।
রাজনীতি ও সাংবাদিকতা
তিনি কেবল কবি ও সংগীতজ্ঞ ছিলেন না, বরং একজন প্রতিবাদী সাংবাদিকও ছিলেন। তিনি ‘ধূমকেতু’ নামের একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন, যা ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করে। ব্রিটিশবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং কারাবাস ভোগ করেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার
১৯২৪ সালে তিনি প্রমীলা দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের চার সন্তান জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু অধিকাংশই শৈশবেই মারা যান।
অসুস্থতা ও মৃত্যু
১৯৪২ সালে নজরুল পিক্স ডিজিজ নামক এক রোগে আক্রান্ত হন, যা তার বাকশক্তি ও মানসিক স্বাভাবিকতা কেড়ে নেয়। পরবর্তী জীবনে তিনি দীর্ঘদিন নির্বাক অবস্থায় কাটান। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসে। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়।
উপসংহার
কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বাংলা সাহিত্যের নয়, বরং সমগ্র বাঙালির চেতনার প্রতীক। তার সাহিত্য ও সংগীত চিরকাল বেঁচে থাকবে বিদ্রোহ, প্রেম ও মানবতার প্রতীক হিসেবে।
0 Comments